পবিত্র ঈদুল আজহা আজ (২৮ মে)। নগরজুড়ে যখন কোরবানির আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে মানুষ ঈদের আমেজে ব্যস্ত, তখনো খুলনার জোড়াগেট পশুর হাটে কাটেনি এক বুক হতাশা আর কান্নার রোল। বড় গরু বিক্রি করতে না পেরে অনেক খামারির মাথায় হাত। শেষ মুহূর্তে ছোট ও মাঝারি গরুর জমজমাট বেচাকেনা হলেও অবিক্রিত থেকে গেছে বিশালাকৃতির অনেক গরু। সাধারণ ক্রেতারা মাঝারি পশু কিনে নিয়ে কোরবানি সম্পন্ন করলেও, বড় গরুর খামারিদের উৎসবের এই রাত কাটছে শূন্য হাতে, একরাশ লোকসানের বোঝা নিয়ে।
অবশ্য হাট ভাঙার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পশু বিক্রি কম হয়নি। খুলনা সিটি কর্পোরেশনের (কেসিসি) নিয়ন্ত্রণ কক্ষের চূড়ান্ত তথ্য অনুযায়ী, জোড়াগেট হাট থেকে মোট ৬ হাজার ৮৮০টি পশু বিক্রি হয়েছে। এর মধ্যে গরু ৪ হাজার ৪৩৩টি, ছাগল ২ হাজার ২৭০টি, ভেড়া ১৭৬টি এবং মহিষ ১টি। এ থেকে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ ৪৪ হাজার ২৩২ টাকা। রাজস্বের খাতায় বড় সাফল্য এলেও, ঈদের রাতে খামারিদের মনে আনন্দের লেশমাত্র নেই।
হাটের শেষ সময়ে ঘুরে দেখা গেছে এক করুণ চিত্র। ছোট ও মাঝারি গরুর খাটালগুলো ফাঁকা হয়ে গেলেও বড় গরুগুলো নিয়ে অবিক্রিত অবস্থায় বিষণ্ণ সময় পার করতে হয়েছে ব্যবসায়ীদের। ক্রেতারা এলেও বড় গরুর দাম শুনে চলে গেছেন, দর-কষাকষির সুযোগও মেলেনি।
তেরখাদার খামারি ইকবাল হোসেন। গত সোমবার ‘সাদা পাহাড়’ ও ‘কালো পাহাড়’ নামে দুটি বিশাল গরু নিয়ে হাটে এসেছিলেন তিনি। ৩৭ মণের গরু দুটির দাম হেঁকেছিলেন ১৫ লাখ টাকা। সর্বোচ্চ দাম উঠেছিল ১১ লাখ। কিন্তু শেষ রাত পর্যন্ত কোনো ক্রেতা আর গরু দুটির দিকে ফিরেও তাকায়নি। লোকসান মেনে ১২ লাখ টাকায় ছাড়তে চাইলেও ক্রেতা মেলেনি। মন খারাপ নিয়ে তিনি বলেন, “ক্রেতারা যে দাম বলে তা দেওয়ার মতো ছিল না। সময় শেষ হয়ে গেল, অথচ এই সাধের গরু দুটি নিয়ে এখন কীভাবে বাড়ি ফিরব বুঝতে পারছি না।”
নড়াইলের মো. ইয়াছিন ১৬টি গরু নিয়ে হাটে এসে মাত্র ৪টি বিক্রি করতে পেরেছেন। তিনি বলেন, বড় গরুর দিকে ক্রেতাদের আগ্রহই ছিল না। অনেকেই যেন মাংসের কেজি মেপে অবাস্তব দাম বলছিলেন।
ফুলতলার মো. সবুজ বাজারের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, “হাটে ক্রেতা-গরু দুই-ই ছিল অনেক। কিন্তু সবাই মাঝারি গরুর দিকে ছুটেছে। আমাদের মতো বড় গরুর চাষীদের কপাল পুড়েছে।”
এদিকে টুটপাড়া এলাকার বাসিন্দা আব্দুল মুহিত বলেন, হাটে এবার প্রকৃত চাষীদের তুলনায় দালালদের দাপট ছিল অনেক বেশি। তাছাড়া বাজারের বাস্তব চাহিদার বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত বড় গরু লালন-পালন করাও খামারিদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ সাধারণ ক্রেতারা মাঝারি গরুর দিকেই বেশি ঝুঁকছেন।
কেসিসি বাজার কর্মকর্তা ও কোরবানির হাট পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব শেখ শফিকুল হাসান দিদার জানান, হাটে রেকর্ড পরিমাণ পশু বিক্রি ও ২ কোটি ১৫ লাখ ৪৪ হাজার ২৩২ টাকা রাজস্ব আদায় হলেও শেষ মুহূর্তে বড় গরুর খামারিদের এই অসহায়ত্ব সত্যিই বেদনাদায়ক।

